সংক্ষেপে উত্তর
দাঁতের ব্যথার জন্য আলাদা কোনো নির্দিষ্ট দোয়া হাদিসে সরাসরি বর্ণিত নেই। তবে শরীরের যেকোনো ব্যথার জন্য নবীজি (সা.) একটি সহিহ ও সুনির্দিষ্ট দোয়া শিখিয়েছেন — সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২২০২। এই দোয়ায় ব্যথার স্থানে হাত রেখে নির্দিষ্ট সংখ্যায় (৩ বার ও ৭ বার) নির্দিষ্ট শব্দ পড়ার নিয়ম আছে, আর যেহেতু দাঁতও শরীরেরই অংশ, তাই এই দোয়া দাঁতের ব্যথায়ও প্রযোজ্য। এর পাশাপাশি অসুস্থতার সাধারণ শিফার দোয়াও পড়া যায়। নিচে দুটি দোয়াই আরবি, উচ্চারণ, অর্থ ও দলিলসহ দেওয়া হলো।
ভূমিকা
দাঁতের ব্যথা এমন একটা কষ্ট, যা রাতের ঘুম কেড়ে নেয়, খাওয়া-দাওয়া কষ্টকর করে তোলে। এমন সময় একজন মুমিনের প্রথম আশ্রয় হওয়া উচিত আল্লাহর কাছে দোয়া, পাশাপাশি প্রয়োজনীয় চিকিৎসাও নেওয়া। নবীজি (সা.) নিজেই আমাদের শিখিয়ে গেছেন, শরীরের যেকোনো ব্যথায় কী বলতে হয় — চলুন সেই শিক্ষাটা সহিহ সূত্র থেকে জেনে নিই।
প্রমাণিত দোয়া
১. শরীরের ব্যথার জন্য দোয়া (সাধারণ, দাঁতের ব্যথাসহ প্রযোজ্য)
আরবি: بِسْمِ اللهِ (৩ বার) أَعُوذُ بِاللهِ وَقُدْرَتِهِ مِنْ شَرِّ مَا أَجِدُ وَأُحَاذِرُ (৭ বার)
উচ্চারণ: বিসমিল্লাহ্ (৩ বার) আউযু বিল্লাহি ওয়া কুদরাতিহি মিন শাররি মা আজিদু ওয়া উহাযিরু (৭ বার)
বাংলা অর্থ: আল্লাহর নামে (৩ বার)। আমি আল্লাহর এবং তাঁর ক্ষমতার আশ্রয় প্রার্থনা করছি, আমি যে কষ্ট অনুভব করছি এবং যে অনিষ্টের আশঙ্কা করছি তা থেকে (৭ বার)।
দলিল: সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২২০২ (কিতাবুস সালাম)। উসমান ইবনে আবিল আস আস-সাকাফি (রা.) বর্ণনা করেন, ইসলাম গ্রহণের পর থেকে তিনি শরীরে একটা ব্যথা অনুভব করতেন, তা নিয়ে তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে অভিযোগ করলে তিনি এই আমল শিখিয়ে দেন।
কীভাবে আমল করবেন: ব্যথার জায়গায় — অর্থাৎ দাঁতের ব্যথা হলে গালের বাইরের দিকে বা যেখানে সরাসরি হাত পৌঁছানো সহজ সেখানে — হাত রেখে প্রথমে তিনবার “বিসমিল্লাহ্” বলবেন, এরপর সাতবার পুরো দোয়াটি পড়বেন। কোনো নির্দিষ্ট সময় বা দিনের কথা হাদিসে বলা হয়নি, তাই ব্যথা অনুভব করার সাথে সাথে যেকোনো সময় এটি পড়া যায়, প্রয়োজনে বারবার। নিয়ত রাখবেন যে শিফা একমাত্র আল্লাহর হাতে, এই আমল একটি উসিলা মাত্র।
২. অসুস্থতার সাধারণ শিফার দোয়া
আরবি: أَذْهِبِ الْبَأْسَ رَبَّ النَّاسِ، اشْفِ أَنْتَ الشَّافِي، لَا شِفَاءَ إِلَّا شِفَاؤُكَ، شِفَاءً لَا يُغَادِرُ سَقَمًا
উচ্চারণ: আয্হিবিল বা’সা রব্বান নাস, ইশ্ফি আনতাশ শাফি, লা শিফা’আ ইল্লা শিফা’উকা, শিফা’আন লা ইউগাদিরু সাক্বামা
বাংলা অর্থ: হে মানুষের প্রতিপালক! কষ্ট দূর করে দাও, তুমিই আরোগ্যদানকারী, তোমার আরোগ্য ছাড়া কোনো আরোগ্য নেই — এমন আরোগ্য দান করো যা কোনো রোগ অবশিষ্ট রাখে না।
দলিল: সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৫৭৪৩ ও সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২১৯১। আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, নবীজি (সা.) অসুস্থ ব্যক্তির জন্য রুকইয়া করার সময় এই দোয়া পড়তেন।
কীভাবে আমল করবেন: এটি মূলত অন্য কেউ অসুস্থ ব্যক্তির জন্য পড়ে, ডান হাত রোগীর শরীরে বা ব্যথার স্থানে রেখে। তবে নিজে অসুস্থ থাকলে নিজের জন্যও এই দোয়া পড়া যায়। নির্দিষ্ট সংখ্যা হাদিসে বলা নেই, তাই যতবার ইচ্ছা আন্তরিকতার সাথে পড়া যায়।
এই দোয়া কোন কোন সমস্যায় প্রযোজ্য
সহিহ মুসলিম ২২০২ নং হাদিসে “জাসাদিকা” (তোমার শরীর) শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, যা নির্দিষ্ট কোনো অঙ্গের কথা বলে না — বরং শরীরের যেকোনো ব্যথার স্থানকে বোঝায়। এ কারণে আলেমরা এই দোয়াকে মাথাব্যথা, দাঁতের ব্যথা, পেটের ব্যথা, গাঁটের ব্যথাসহ শরীরের যেকোনো শারীরিক ব্যথায় প্রযোজ্য বলে থাকেন। দ্বিতীয় দোয়াটি (আয্হিবিল বা’সা) সাধারণভাবে যেকোনো অসুস্থতা বা রোগের জন্য প্রযোজ্য, দাঁতের ব্যথাও এর আওতায় পড়ে।
দাঁতের জন্য কি আলাদা কোনো দোয়া আছে?
সৎভাবে বলতে গেলে — না। ছয় হাদিসগ্রন্থ ঘেঁটে দাঁতের ব্যথার জন্য নির্দিষ্টভাবে বর্ণিত কোনো সহিহ বা হাসান হাদিস পাওয়া যায় না। উপরে উল্লেখিত দুটি দোয়াই শরীরের সাধারণ ব্যথা ও অসুস্থতার জন্য, দাঁতের ব্যথায়ও যার প্রয়োগ যুক্তিসঙ্গত ও আলেমদের কাছে স্বীকৃত। ইন্টারনেটে দাঁতের জন্য “বিশেষ” বলে প্রচারিত কিছু দোয়া ঘুরে বেড়ায়, যেগুলোর সহিহ সনদ পাওয়া যায় না — সেগুলো এড়িয়ে চলাই নিরাপদ।
চিকিৎসা সংক্রান্ত সতর্কতা
দোয়া ও রুকইয়া আল্লাহর কাছে আশ্রয় ও শিফা চাওয়ার মাধ্যম, কিন্তু তা প্রয়োজনীয় চিকিৎসার বিকল্প নয়। নবীজি (সা.) নিজেই চিকিৎসা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। দাঁতের ব্যথা দীর্ঘস্থায়ী হলে, ফুলে গেলে বা জ্বরের সাথে থাকলে দ্রুত একজন যোগ্য ডেন্টিস্টের কাছে যাওয়া জরুরি — দোয়া পড়ার পাশাপাশি চিকিৎসা নেওয়াই সুন্নাহসম্মত পথ।
প্রশ্নোত্তর (FAQ)
দাঁতের ব্যথায় কতবার দোয়াটি পড়তে হয়? “বিসমিল্লাহ্” তিনবার, এরপর পুরো দোয়া সাতবার — সহিহ মুসলিম ২২০২ নং হাদিসে এই সংখ্যা নির্দিষ্ট করা আছে।
হাত কোথায় রাখতে হবে? ব্যথার স্থানে বা তার কাছাকাছি জায়গায়, অর্থাৎ দাঁতের ব্যথায় সংশ্লিষ্ট গালের বাইরের দিকে।
দিনে কতবার পড়া যায়? নির্দিষ্ট কোনো সীমা হাদিসে নেই, প্রয়োজন অনুযায়ী বারবার পড়া যায়।
এই দোয়া কি শুধু দাঁতের জন্য নির্দিষ্ট? না, এটি শরীরের যেকোনো ব্যথার জন্য সাধারণ দোয়া, দাঁতের ব্যথাও এর আওতাভুক্ত।
দোয়া পড়ার পরও ব্যথা না কমলে কী করব? দোয়া চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি ডেন্টিস্টের পরামর্শ নেওয়া উচিত — শিফা আল্লাহর ইচ্ছাধীন, আর চিকিৎসা গ্রহণ সুন্নাহ।
অন্য কারো জন্য এই দোয়া পড়া যায় কি? হ্যাঁ, বিশেষত দ্বিতীয় দোয়াটি (আয্হিবিল বা’সা) মূলত অন্যের জন্য পড়ার উদ্দেশ্যেই বর্ণিত হয়েছে।
সূরা ফাতিহা বা আয়াতুল কুরসি কি একসাথে পড়া যাবে? হ্যাঁ, সাধারণ রুকইয়া হিসেবে সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি ও মুআওবিযাতাইন (সূরা ফালাক-নাস) পড়া প্রমাণিত ও উপকারী, তবে এগুলো দাঁতের জন্য নির্দিষ্ট নয়, সাধারণ শিফার আমল।
এই দোয়ায় কি নিশ্চিত ব্যথা সেরে যাবে? আরোগ্য সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর ইচ্ছাধীন। দোয়া একটি প্রমাণিত উসিলা, কিন্তু “নিশ্চিত রোগমুক্তি”র নিশ্চয়তা কোনো হাদিসেই দেওয়া হয়নি।
উপসংহার
দাঁতের ব্যথায় নির্দিষ্ট কোনো দোয়া না থাকলেও, নবীজি (সা.)-এর শেখানো শরীরের সাধারণ ব্যথার দোয়া (সহিহ মুসলিম ২২০২) ও শিফার দোয়া (বুখারি ৫৭৪৩, মুসলিম ২১৯১) পূর্ণ আন্তরিকতার সাথে পড়া যায়। সাথে সাথে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাও নিতে হবে — কারণ দোয়া ও চিকিৎসা একে অপরের পরিপূরক, বিকল্প নয়।
References
- সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২২০২ (কিতাবুস সালাম) — sunnah.com/muslim:2202
- সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৫৭৪৩ — sunnah.com/bukhari:5743
- সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২১৯১ — sunnah.com/muslim:2191
- আরও জানতে বা সুনির্দিষ্ট পরামর্শের জন্য যোগাযোগ করুন —
- +880 1313-882464 | assunnahhealthcare@gmail.com
- আল্লাহ আপনাকে ও আপনার প্রিয়জনদের দ্রুত আরোগ্য দান করুন। আমিন









