
রমজান মাস—রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস। প্রতিদিন ১৩-১৬ ঘণ্টা না খেয়ে, তৃষ্ণা সহ্য করে, গরমে কষ্ট করে রোজা রেখেছেন। সাহরি করে উঠেছেন, ইফতারের অপেক্ষায় থেকেছেন—সবই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য।
কিন্তু কল্পনা করুন: রমজান শেষ হয়ে গেল, আর যদি জানতে পারেন আপনার একটা রোজাও কবুল হয়নি! সারা মাসের ক্ষুধা-তৃষ্ণা, ক্লান্তি—সব বৃথা। শুধু শারীরিক কষ্ট ছাড়া কিছুই অর্জন হয়নি। এটা কি ভয়ানক নয়?
দুঃখজনক সত্য যে, আমাদের সমাজের অনেকের সাথেই এমনটা ঘটে। তারা রোজা রাখেন ঠিকই, কিন্তু রোজার আসল সওয়াব থেকে বঞ্চিত হন। কেন? আসুন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদিস থেকে জেনে নিই।
রাসূল ﷺ-এর সতর্কবাণী: “ক্ষুধা ছাড়া আর কিছু জোটে না!”
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“কত রোজাদার আছে যাদের রোজার বিনিময়ে ক্ষুধা ছাড়া আর কিছুই জোটে না!”
— সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৬৯০ (হাসান-সহিহ)
এই হাদিসে স্পষ্ট যে, অনেকে রোজা রাখেন, কিন্তু তাদের প্রাপ্তি শুধু ক্ষুধা ও তৃষ্ণার কষ্ট। আল্লাহ তাদের রোজা কবুল করেন না। কেন? পরের হাদিসে এর কারণ ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
রাসূল ﷺ আরও বলেন:
“যে ব্যক্তি মিথ্যা বলা ও সে অনুযায়ী আমল বর্জন করেনি, তার এ পানাহার পরিত্যাগ করায় আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।”
— সহিহ বুখারী: ১৯০৩
অর্থাৎ—রোজা রেখেও যদি মিথ্যা বলেন, গীবত করেন, অশ্লীল কথা বলেন, রাগ-ঝগড়া করেন, আমানতের খেয়ানত করেন—তাহলে আল্লাহ আপনার না খাওয়া-না পান করার কোনো মূল্য দেন না। রোজা তো শারীরিক ইবাদত, কিন্তু তার মূল উদ্দেশ্য তাকওয়া অর্জন।
কুরআনে আল্লাহ বলেন:
“হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর ফরজ করা হয়েছিল—যাতে তোমরা মুত্তাকী হতে পারো।”
— সূরা বাকারা: ১৮৩
রোজা শুধু পেট খালি রাখা নয়—এটা জিহ্বা, চোখ, কান, হাত-পা সবকিছুকে পাপ থেকে বিরত রাখার প্রশিক্ষণ।
রোজা নষ্ট করে এমন সাধারণ গুনাহগুলো কী কী?
দৈনন্দিন জীবনে আমরা যেসব কাজ করি, সেগুলো রোজার সওয়াব নষ্ট করে দেয়:
বাসায় ফিরে স্ত্রী/সন্তানের ওপর রাগ ঝাড়া, গালি দেওয়া বা অপমান করা
রাস্তায় রিকশাওয়ালা/দোকানদার/সহকর্মীর সাথে ঝগড়া-ঝামেলা
বন্ধুদের সাথে বসে গীবত (পরনিন্দা) বা পরচর্চা করা
মিথ্যা বলা, ঘুষ খাওয়া, আমানতের খেয়ানত
হারাম দৃষ্টি দেওয়া, অশ্লীল কথা-বার্তা বা সোশ্যাল মিডিয়ায় অশ্লীল কন্টেন্ট দেখা/শেয়ার করা
এসব করলে রোজা শারীরিকভাবে হয়তো রাখা হয়, কিন্তু আধ্যাত্মিকভাবে তা ভেঙে যায়। রাসূল ﷺ বলেন—এমন রোজার আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।
রোজার পূর্ণ সওয়াব পাওয়ার একমাত্র উপায়: উত্তম চরিত্র গড়ে তোলা
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
“যে ব্যক্তি তার চরিত্রকে সৌন্দর্যমন্ডিত করেছে, আমি তার জন্য জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থানে একটি ঘরের জিম্মাদার।”
— সুনানে আবু দাউদ: ৪৮০০ (হাসান)
উত্তম চরিত্রই ইবাদতের মূল। রোজা রেখে যদি আমরা:
জিহ্বাকে মিথ্যা, গীবত, গালি থেকে বিরত রাখি
রাগ সংযত করি, ক্ষমা করে দিই এবং সদয় ব্যবহার করি
আমানত রক্ষা করি, সত্য কথা বলি
অন্যের প্রতি সহানুভূতি ও ভালোবাসা দেখাই
তাহলে আল্লাহ আমাদের রোজা কবুল করবেন এবং জান্নাতের উচ্চ স্থান দান করবেন।
এই রমজান থেকেই পরিবর্তন শুরু করুন—একটা করে সিদ্ধান্ত নিন:
আজ থেকে মিথ্যা বলা একদম ছেড়ে দেব
গীবত ও পরনিন্দা থেকে দূরে থাকব
রাগ হলে “আমি রোজাদার” বলে নিজেকে সংযত করব
পরিবার ও সমাজে সদয় আচরণ বাড়াব
প্রতিদিন তওবা করব এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইব
রমজান শুধু না খাওয়া-না পান করার মাস নয়—এটা নিজেকে নতুন করে গড়ে তোলার, তাকওয়া অর্জনের সুবর্ণ সুযোগ। আল্লাহ আমাদের সকলের রোজা কবুল করুন, গুনাহ মাফ করুন এবং জান্নাতুল ফিরদাউস দান করুন। আমীন।
✍️ লিখেছেন: Raqi Hm Mosharrof Hossain