বদনজরের রুকইয়াহ ও গোসলের নিয়ম: লক্ষণ, করণীয় ও সঠিক পদ্ধতি

বদনজরের রুকইয়াহ ও গোসলের নিয়ম—বদনজরের প্রতিকারের জন্য রুকইয়াহর পানি

বদনজর লাগার লক্ষণ কী? বদনজরের রুকইয়াহ কীভাবে করবেন? বদনজরের গোসলের নিয়ম কী?

এগুলো নিয়ে অনেকের মনে প্রশ্ন থাকে। ইসলামে বদনজরের বাস্তবতা স্বীকৃত এবং রাসুলুল্লাহ ﷺ বদনজরের ক্ষেত্রে রুকইয়াহ ও গোসলের মাধ্যমে চিকিৎসার নির্দেশ দিয়েছেন। জামে‘ আত-তিরমিজির একটি হাদিসে এসেছে, “চোখের নজর সত্য” এবং যখন এর জন্য গোসল করাতে বলা হয়, তখন গোসল করতে বলা হয়েছে।

তবে কোনো শারীরিক বা মানসিক সমস্যাকে শুধুমাত্র বদনজরের কারণে হয়েছে বলে নিশ্চিত করা ঠিক নয়। নিচের লক্ষণগুলো বিভিন্ন অসুস্থতা বা অন্য কারণেও হতে পারে। তাই প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার পাশাপাশি শরিয়তসম্মত রুকইয়াহ করা যেতে পারে।

বদনজর কী?

বদনজর বা ‘আয়ন’ বলতে কারও কোনো ব্যক্তি, সৌন্দর্য, সম্পদ, সন্তান, সামর্থ্য বা কোনো নিয়ামত দেখে এমন দৃষ্টি দেওয়া বোঝায়, যার কারণে আল্লাহর ইচ্ছায় ক্ষতি বা অসুস্থতা হতে পারে।

বদনজর সবসময় ইচ্ছাকৃতভাবে দেওয়া হয়—এমন নয়। কোনো ব্যক্তি নিজের অজান্তেও কারও কোনো বিষয় দেখে প্রভাবিত হতে পারেন। এজন্য কারও কোনো বিষয় ভালো লাগলে তার জন্য বরকতের দোয়া করা উচিত। সাহল ইবনু হুনাইফ (রাঃ)-এর ঘটনায় রাসুলুল্লাহ ﷺ এ বিষয়ে সতর্ক করেছেন।


বদনজর লাগার সম্ভাব্য লক্ষণসমূহ

অনেক সময় মানুষ হঠাৎ এমন কিছু শারীরিক, মানসিক বা আচরণগত পরিবর্তন লক্ষ্য করেন যার কোনো স্পষ্ট কারণ খুঁজে পান না। নিচের কিছু বিষয় বদনজরের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে রুকইয়াহর ক্ষেত্রে বিবেচনা করা হয়। তবে এগুলো কোনো মেডিকেল ডায়াগনসিস বা বদনজরের নিশ্চিত আলামত নয়।

সম্ভাব্য কিছু লক্ষণ

১. শরীরে গরম বা জ্বর জ্বর অনুভূতি থাকা, কিন্তু থার্মোমিটারে জ্বর না থাকা।

২. কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই বারবার কান্না পাওয়া বা অস্থিরতা অনুভব করা।

৩. কাজে মনোযোগ দিতে কষ্ট হওয়া এবং পড়াশোনা, নামাজ, যিকির বা অন্যান্য ভালো কাজে মন না বসা।

৪. বারবার দুর্বল লাগা, ক্ষুধামন্দা বা বমি বমি ভাব থাকা।

৫. চেহারায় অস্বাভাবিক ফ্যাকাশে, ধূসর বা হলুদাভ ভাব দেখা দেওয়া।

৬. বুক ধড়ফড় করা বা দমবন্ধ ধরনের অস্বস্তি অনুভূত হওয়া।

৭. অল্পতেই মেজাজ খারাপ হয়ে যাওয়া বা অস্বাভাবিক বিরক্তি তৈরি হওয়া।

৮. আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হলে অস্বস্তি বা অনীহা অনুভব করা।

৯. অতিরিক্ত চুল পড়া বা চুলের সমস্যার সঙ্গে অন্য অস্বাভাবিক উপসর্গ থাকা।

১০. পেটে অতিরিক্ত গ্যাস বা হজমের সমস্যা হওয়া।

১১. বারবার বিভিন্ন ধরনের অসুস্থতা হওয়া বা দীর্ঘদিন ধরে কোনো সমস্যায় ভোগা।

১২. হাত-পা বা শরীরের বিভিন্ন অংশে ব্যথা বা অস্বস্তি অনুভব করা।

১৩. ব্যবসা বা কর্মক্ষেত্রে ধারাবাহিক সমস্যার মুখোমুখি হওয়া।

১৪. যে কাজটি সাধারণত ভালোভাবে করতে পারেন, সেটি করতে গেলেই অস্বাভাবিক দুর্বলতা বা অসুস্থতা অনুভব করা।

গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা

শুধু ১–২টি লক্ষণ মিললেই নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না যে বদনজর লেগেছে। যেমন—চুল পড়া, গ্যাস, মাথাব্যথা, দুর্বলতা, বুক ধড়ফড় বা মনোযোগের সমস্যা থাইরয়েড, রক্তস্বল্পতা, ঘুমের সমস্যা, উদ্বেগ, পুষ্টির ঘাটতি, হজমের সমস্যা কিংবা অন্যান্য শারীরিক কারণে হতে পারে।

তাই দীর্ঘস্থায়ী বা গুরুতর উপসর্গ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। রুকইয়াহ চিকিৎসা গ্রহণ করলেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পরীক্ষা বা চিকিৎসা বন্ধ করা উচিত নয়।


বদনজরের রুকইয়াহ করার নিয়ম

বদনজরের ক্ষেত্রে মূলত দুই ধরনের পরিস্থিতি হতে পারে।

প্রথমত: কার কাছ থেকে বদনজর লেগেছে তা জানা আছে।

দ্বিতীয়ত: কার কাছ থেকে বদনজর লেগেছে তা জানা নেই।

কার কাছ থেকে বদনজর লেগেছে তা জানা থাকলে হাদিসে বর্ণিত গোসলের পদ্ধতি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।


১. কার নজর লেগেছে জানা থাকলে কী করবেন?

সাহল ইবনু হুনাইফ (রাঃ)-এর ঘটনায় আমির ইবনু রাবি‘আহ (রাঃ)-এর দৃষ্টির পর সাহল (রাঃ) অসুস্থ হয়ে পড়েন। বিষয়টি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে জানানো হলে তিনি আমির (রাঃ)-কে গোসল/ওযু করার নির্দেশ দেন এবং সেই পানি আক্রান্ত ব্যক্তির ওপর ঢেলে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। এরপর সাহল (রাঃ) সুস্থ হয়ে যান।

আরেক বর্ণনায় এসেছে, আমির (রাঃ) মুখ, হাত, কনুই, হাঁটু, পায়ের অংশ এবং শরীরের ভেতরের কাপড়ের অংশ ধুয়ে সেই পানি একটি পাত্রে সংগ্রহ করেন এবং তা সাহল (রাঃ)-এর ওপর ঢেলে দেওয়া হয়।

সহজভাবে পদ্ধতিটি

১. যাঁর নজর লেগেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, তাঁকে বিষয়টি শান্তভাবে জানানো হবে।

২. তাঁকে ওযু বা হাদিসে বর্ণিত গোসলের পানি সংগ্রহ করতে বলা হবে।

৩. পানি একটি পরিষ্কার পাত্রে সংগ্রহ করা হবে।

৪. সেই পানি আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে ঢেলে দেওয়া হবে।

৫. আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে সুস্থতার জন্য দোয়া করতে হবে।

এটি কোনো কুসংস্কারভিত্তিক পদ্ধতি নয়; বদনজরের ক্ষেত্রে সাহাবায়ে কেরামের ঘটনায় এর ভিত্তি পাওয়া যায়।


২. নিজের নজর নিজেকেই লাগলে কী করবেন?

অনেক সময় মানুষ নিজের কোনো সৌন্দর্য, সন্তান, সম্পদ বা অর্জন দেখে অতিরিক্ত প্রশংসা করেন। তাই নিজের কোনো বিষয় ভালো লাগলে আল্লাহর কাছে বরকতের দোয়া করা উচিত।

যদি নিজের নজর নিজের ওপর পড়েছে বলে আশঙ্কা হয়, তাহলে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চেয়ে শরিয়তসম্মত রুকইয়াহ করা যেতে পারে।

এক্ষেত্রে নিজের ওপর কুরআনের আয়াত ও মাসনুন দোয়া পড়ে রুকইয়াহ করা এবং রুকইয়াহর পানি ব্যবহার করা যেতে পারে।


৩. বদনজরের রুকইয়াহর গোসলের পদ্ধতি

অনেকে রুকইয়াহর জন্য পানিতে কুরআনের আয়াত পড়ে গোসল করেন। এটি রুকইয়াহর একটি প্রচলিত পদ্ধতি। তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি—সহিহ হাদিসে বদনজরের গোসলের জন্য নির্দিষ্টভাবে “বালতিতে পানি নিয়ে দুই হাত ডুবিয়ে ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি ও চার কুল ৭ বার করে পড়তে হবে”—এমন নির্দিষ্ট সংখ্যা বর্ণিত নেই।

তাই এটিকে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নির্ধারিত সুন্নাহ পদ্ধতি হিসেবে দাবি না করে, সাধারণ শরিয়তসম্মত রুকইয়াহ হিসেবে উল্লেখ করা অধিক সতর্কতার বিষয়।

রুকইয়াহর পানির একটি প্রচলিত পদ্ধতি

একটি পরিষ্কার পাত্র বা বালতিতে পানি নিন।

এরপর পানির ওপর বা পানিতে হাত রেখে পড়তে পারেন—

  • দরুদ শরিফ
  • সূরা আল-ফাতিহা
  • আয়াতুল কুরসি
  • সূরা আল-কাফিরুন
  • সূরা আল-ইখলাস
  • সূরা আল-ফালাক
  • সূরা আন-নাস

এরপর আল্লাহর কাছে সুস্থতার জন্য দোয়া করে সেই পানি দিয়ে গোসল করতে পারেন।

কেউ চাইলে কুরআন ও সহিহ মাসনুন দোয়া পড়ে পানির ওপর হালকা ফুঁ দিতে পারেন। তবে ফুঁ দেওয়াকে বাধ্যতামূলক মনে করা যাবে না।


রুকইয়াহর গোসলের সময় কয়েকটি বিষয়

গোসলের আগে রুকইয়াহ করা

সম্ভব হলে গোসলের আগে কুরআন ও মাসনুন দোয়ার মাধ্যমে রুকইয়াহ করা যেতে পারে। তবে আগে শুনতে বা পড়তে না পারলেও অন্য সময় রুকইয়াহ করা যায়।

রোগী নিজে পড়তে না পারলে

রোগী নিজে পড়তে না পারলে পরিবারের অন্য কোনো ব্যক্তি শরিয়তসম্মত রুকইয়াহর আয়াত ও দোয়া পড়ে দিতে পারেন।

বাথরুমে কুরআন পড়ার বিষয়

যদি টয়লেট ও গোসলের স্থান একই জায়গায় হয়, তাহলে কুরআন তিলাওয়াতের আদব ও ফিকহি বিধান বিবেচনা করে পরিষ্কার স্থান বা বাথরুমের বাইরে রুকইয়াহ করে পানি প্রস্তুত করা অধিক সতর্কতার বিষয়।

পরে সাধারণ পানি দিয়ে গোসল

রুকইয়াহর পানি ব্যবহারের পর প্রয়োজন হলে সাধারণ পানি দিয়ে শরীর পরিষ্কার করে নেওয়া যেতে পারে।


পানিতে বরইপাতা দেওয়া কি জরুরি?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বদনজর বা রুকইয়াহর গোসলের পানিতে বিভিন্ন ধরনের পাতা, বিশেষ করে বরইপাতা ব্যবহারের কথা দেখা যায়।

তবে সাহল ইবনু হুনাইফ (রাঃ)-এর বদনজরের ঘটনায় বরইপাতা ব্যবহারের কথা নেই। সেখানে পানি দ্বারা গোসল/ধৌত করার বিষয়টি এসেছে।

তাই বরইপাতাকে বদনজর দূর করার জন্য অপরিহার্য বা সুন্নাহর শর্ত হিসেবে প্রচার করা ঠিক নয়।


কার কাছ থেকে বদনজর লেগেছে জানা না থাকলে?

অনেক ক্ষেত্রেই কারও বিরুদ্ধে নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব হয় না যে তাঁর নজরের কারণে সমস্যা হয়েছে।

এমন অবস্থায় কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে দোষারোপ করা উচিত নয়।

বরং—

  • নিয়মিত নামাজ আদায় করা
  • সকাল-সন্ধ্যার মাসনুন যিকির করা
  • কুরআন তিলাওয়াত করা
  • সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি, ইখলাস, ফালাক ও নাস পড়া
  • মাসনুন দোয়ার মাধ্যমে নিজের ওপর রুকইয়াহ করা
  • আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করা

এসব আমল করা উচিত।

রাসুলুল্লাহ ﷺ হাসান ও হুসাইন (রাঃ)-এর জন্য বদনজরসহ বিভিন্ন অনিষ্ট থেকে আল্লাহর আশ্রয় চেয়ে দোয়া করতেন।


কতদিন রুকইয়াহ ও গোসল করবেন?

রুকইয়াহর জন্য নির্দিষ্টভাবে ৩ দিন, ৭ দিন বা ২১ দিনের বাধ্যতামূলক কোনো সময়সীমা সহিহ হাদিসে নির্ধারিত নেই।

তাই “৩ দিন করতেই হবে”, “৭ দিন না করলে কাজ হবে না” বা “২১ দিন করলেই নিশ্চিতভাবে বদনজর চলে যাবে”—এ ধরনের কথা শরিয়তের নির্ধারিত বিধান হিসেবে বলা উচিত নয়।

কেউ নিয়মিত রুকইয়াহ ও দোয়া করতে চাইলে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী করতে পারেন। সুস্থতা আল্লাহর হাতে।


রুকইয়াহ অডিও শুনলেই কি যথেষ্ট?

রুকইয়াহর অডিও কুরআন ও দোয়া শোনার একটি মাধ্যম হতে পারে। তবে এটিকে একমাত্র চিকিৎসা বা নিশ্চিত সমাধান মনে করা ঠিক নয়।

নিজে কুরআন পড়া, দোয়া করা, সকাল-সন্ধ্যার যিকির, নামাজ এবং আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল—এসব আমলও গুরুত্বপূর্ণ।

শারীরিক অসুস্থতা থাকলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাও চালিয়ে যেতে হবে।


বদনজর থেকে বাঁচার করণীয়

বদনজর থেকে সুরক্ষার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক শক্ত করা এবং নিয়মিত মাসনুন আমল করা।

নিয়মিত যে আমলগুলো করা যেতে পারে

১. পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা

২. সকাল-সন্ধ্যার যিকির করা

৩. আয়াতুল কুরসি পড়া

৪. সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস পড়া

৫. নিজের ও পরিবারের জন্য মাসনুন দোয়া করা

৬. কোনো নিয়ামত দেখে বরকতের দোয়া করা

৭. অহেতুক নিজের সম্পদ, সন্তান, সৌন্দর্য বা ব্যক্তিগত নিয়ামত প্রদর্শন থেকে বিরত থাকা

৮. আল্লাহর ওপর পূর্ণ তাওয়াক্কুল রাখা


কখন চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরি?

বদনজরের আশঙ্কা থাকলেও কোনো শারীরিক সমস্যাকে শুধু রুকইয়াহর কারণে হয়েছে ধরে নিয়ে চিকিৎসা বন্ধ করা উচিত নয়।

বিশেষ করে—

  • দীর্ঘদিন জ্বর
  • বুকব্যথা বা তীব্র বুক ধড়ফড়
  • শ্বাসকষ্ট
  • অজ্ঞান হয়ে যাওয়া
  • দীর্ঘস্থায়ী বমি
  • দ্রুত ওজন কমে যাওয়া
  • তীব্র মাথাব্যথা
  • দীর্ঘদিনের দুর্বলতা
  • অস্বাভাবিক রক্তপাত
  • গুরুতর মানসিক অস্থিরতা

থাকলে দ্রুত যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

রুকইয়াহ ও চিকিৎসা একে অপরের বিকল্প হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। একজন মুসলিম আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে বৈধ চিকিৎসা গ্রহণ করতে পারেন এবং একই সঙ্গে কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক দোয়া ও রুকইয়াহ করতে পারেন।


বদনজরের রুকইয়াহ: সংক্ষেপে করণীয়

যদি মনে হয় বদনজরের প্রভাব থাকতে পারে, তাহলে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই।

প্রথমে: আল্লাহর ওপর ভরসা করুন।

দ্বিতীয়ত: নামাজ ও মাসনুন যিকির নিয়মিত করুন।

তৃতীয়ত: কুরআনের আয়াত ও মাসনুন দোয়ার মাধ্যমে নিজের ওপর রুকইয়াহ করুন।

চতুর্থত: কার নজর লেগেছে তা নিশ্চিতভাবে জানা থাকলে হাদিসে বর্ণিত গোসলের পদ্ধতি অনুসরণ করা যেতে পারে।

পঞ্চমত: শারীরিক অসুস্থতার লক্ষণ থাকলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণ করুন।


Frequently Asked Questions (FAQ)

বদনজর লাগার সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ কী?

বদনজরের নির্দিষ্ট একটি লক্ষণ নেই। দুর্বলতা, অস্থিরতা, মনোযোগের সমস্যা, শারীরিক অস্বস্তি ইত্যাদি বিভিন্ন কারণে হতে পারে। তাই শুধু একটি বা দুটি লক্ষণ দেখে বদনজর নিশ্চিত করা যায় না।

বদনজর কি সত্যিই আছে?

হ্যাঁ। সহিহ ও হাসান হাদিসে বদনজরের বাস্তবতার কথা এসেছে। জামে‘ আত-তিরমিজিতে রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “চোখের নজর সত্য।”

কার নজর লেগেছে কীভাবে বুঝব?

সবসময় জানা সম্ভব নয়। কোনো ব্যক্তিকে শুধু সন্দেহের ভিত্তিতে বদনজরের জন্য দায়ী করা উচিত নয়। যদি স্পষ্ট প্রমাণ বা ঘটনা না থাকে, তাহলে সাধারণ রুকইয়াহ ও দোয়া করা যেতে পারে।

কার নজর লেগেছে জানা থাকলে কী করব?

হাদিসে বর্ণিত সাহল ইবনু হুনাইফ (রাঃ)-এর ঘটনায় যাঁর নজর লেগেছিল, তাঁকে গোসল/ধৌত করার পানি সংগ্রহ করে আক্রান্ত ব্যক্তির ওপর ঢেলে দেওয়া হয়েছিল এবং তিনি সুস্থ হয়ে যান।

বদনজরের গোসলের পানিতে বরইপাতা দেওয়া কি জরুরি?

না। বদনজরের সহিহ হাদিসে বরইপাতাকে শর্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। তাই এটিকে আবশ্যিক সুন্নাহ মনে করা ঠিক নয়।

বদনজরের জন্য কোন কোন সূরা পড়া যায়?

সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি, সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাসসহ কুরআনের অন্যান্য আয়াত পড়ে রুকইয়াহ করা যায়। মাসনুন দোয়াও পড়া উচিত।

বদনজরের রুকইয়াহ কতদিন করতে হয়?

এর জন্য সহিহ হাদিসে নির্দিষ্ট ৩, ৭ বা ২১ দিনের বাধ্যতামূলক সময় নির্ধারিত নেই। নিয়মিত দোয়া, যিকির ও রুকইয়াহ করা যেতে পারে।

রুকইয়াহর পানি দিয়ে গোসল করার পর আবার সাধারণ পানি দিয়ে গোসল করা যাবে?

হ্যাঁ। রুকইয়াহর পানি ব্যবহারের পর শরীর পরিষ্কার করার জন্য সাধারণ পানি ব্যবহার করা যেতে পারে।

রুকইয়াহর পানি পান করা যাবে কি?

রুকইয়াহর পানির ব্যবহার নিয়ে আলেমদের মধ্যে বিভিন্ন মতামত রয়েছে। কোনো নির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করতে চাইলে বিশ্বস্ত আলেমের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

রুকইয়াহ অডিও শুনলে কি বদনজর চলে যায়?

রুকইয়াহ অডিও শোনা কুরআন ও দোয়া শোনার একটি মাধ্যম। তবে এটিকে নিশ্চিত চিকিৎসা হিসেবে ধরা উচিত নয়। নিজে কুরআন পড়া, দোয়া, যিকির ও আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করা গুরুত্বপূর্ণ।

বদনজরের কারণে গ্যাস বা চুল পড়তে পারে কি?

এসব বিষয়কে শুধু বদনজরের কারণে হয়েছে বলে নিশ্চিত করা যায় না। গ্যাস, চুল পড়া, দুর্বলতা ইত্যাদির অনেক চিকিৎসাবিজ্ঞানের কারণ থাকতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

বদনজর থেকে বাঁচার সবচেয়ে ভালো উপায় কী?

নামাজ, সকাল-সন্ধ্যার যিকির, কুরআন তিলাওয়াত, মাসনুন দোয়া, আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল এবং কোনো নিয়ামত দেখে তার জন্য বরকতের দোয়া করা—এসব নিয়মিত আমল করা উচিত।


উপসংহার

বদনজর ইসলামী শরিয়তে স্বীকৃত একটি বিষয়। একই সঙ্গে একজন মুসলিমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো—বদনজর নিয়ে অতিরিক্ত ভয় বা সন্দেহে না ভোগা এবং প্রত্যেকটি অসুস্থতাকে জিন, জাদু বা বদনজর হিসেবে ধরে না নেওয়া।

কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক রুকইয়াহ, দোয়া ও যিকিরের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণ করাও ইসলামীভাবে গ্রহণযোগ্য। আর কারও প্রতি বদনজরের অভিযোগ করার আগে যথেষ্ট সতর্ক থাকা জরুরি।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সব ধরনের অনিষ্ট, বদনজর ও বিপদ থেকে হেফাজত করুন এবং অসুস্থদের পূর্ণ শিফা দান করুন। আমিন।


Scroll to Top